অভিবাসী ভাবনা

ছাত্র ছিলাম, জাগতিক তেমন কোন চিন্তা ছিল না। আট-দশজনের মতই মা-বাবাকে বিরক্ত করতাম নানা অজুহাতে। খুব ভালবেসে সন্তানের প্রায় সকল দাবী মেনে নিতেন। আমিও খুশি, ভাবতাম অধিকার আদায় করে নিয়েছি! আড্ডা-প্রিয় ছিলাম খুব, বন্ধুরা অনেক ভালবাসতো।

পড়াশোনার পাঠ শেষ না হতেই হতে হলো পরবাসি। ঠাঁই হলো ইউরোপের পর্যটন নগরী বার্সেলোনাতে। অভিবাসী হিসেবে যুগপুর্তি অনেক আগেই পালন করেছি। প্রথম দিকে মানিয়ে নিতে কষ্ট হয় খুব। তবে এখন মনে হয় এটাই আমার বাস্তব ঠিকানা, যদিও শেকড়ের টানে প্রায়ই মোচড় লাগে নিজের ভেতর।

পরিবেশগত বা জীবন মানের কারণে হলেও নিজেদের কিছুটা পরিবর্তন করতে হয় ভিনদেশী হওয়াতে। ‘প্রবাসী’ শব্দের সাথে সকলে পরিচিত, তথাপিও কেন জানি বেশ ইচ্ছে হয়,  আবারও পরিচয় করিয়ে দিতে শব্দটার সাথে। এক কথায়, প্রবাসী তারাই যারা বিভিন্ন কারণে নিজ দেশ ত্যাগ করেছেন। অবশ্য, ‘প্রবাসী’ আর ‘অভিবাসী’ এ শব্দ দুটোর মধ্যে অর্থগত কিছুটা পার্থক্য আছে। ইউরোপে যারা বসবাস করেন তাদের ক্ষেত্রে ‘অভিবাসী’ শব্দটি মানায়, সেটা অন্য প্রসঙ্গ।

নতুন শহর, নতুন পরিবেশ হওয়াতে ভাললাগার পাশাপাশি অনেক কিছুই বিমোহিত করেছে আমাকে। বেশি ভালোলাগে, যখন দেখি আমাদের প্রবাসী বাংলাদেশীরা প্রতিষ্ঠিত হয়ে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। দলবদ্ধ বা সাংগঠনিকভাবে দেশকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতার উদ্দেশ্যে ইউনিয়ন থেকে শুরু করে বিভাগ পর্যায়ে, আবার বাংলাদেশ নাম নিয়েও একাধিক সংগঠন পরিচালনা করছেন। 

পরদেশে দেশীয় রাজনৈতিক সংগঠনের অনুমতি না থাকলেও মূল সংগঠন থেকে শুরু করে অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠনগুলোর শাখাও বেশ তৎপর। এ সমস্ত সাংগঠনিক কর্মকান্ড অনেক সময় দেশীয় আমেজ ফিরিয়ে আনে ঠিকই, কিন্তু কোন কোন ক্ষেত্রে নিজেদের জাত চেনাতে গিয়ে সামজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে।  

      প্রবাসযুদ্ধ শুরুর আগের জীবনে অনেকেই বিছানা ছাড়াতেন বেলা গড়িয়ে, কিন্তু ‘প্রবাসী’ নাম লাগাতেই উনারা নতুন উদ্যোমে প্রাত্যাহিক জীবন শুরু করেছেন, নিজেকে রাখছেন কর্মব্যস্ত। রাজপথ কাঁপানো ছাত্রনেতাও সময়ের যাঁতাকলে সকাল থেকে রাত অবধি কর্মস্থলে হাজিরা দিচ্ছেন। 

প্রবাসী বা অভিবাসী হিসেবে সব কিছুই ঠিক আছে, আছে প্রবাসী হিসেবে দেশীয় অর্থনৈতিক মুক্তিতে ‘রেমিটেন্স যোদ্ধা’ খেতাব। বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া ‘বাংলদেশী’ হিসেবে, দেশের বাহিরে ভদ্র জাতি হিসেবে আছে বেশ পরিচিতও আমরা।

কর্মঠ জাতি হিসেবে বিদেশ-বিভুঁইয়ে সম্মান অর্জন করলেও নিজেদের মধ্যকার হিংস-বিদ্বেষ, হানাহানি, নেতৃত্বে আসার ঘৃণ্য প্রতিযোগিতা অনেককেই ভাবিয়ে তুলেছে। আসলে আইডেন্টি ক্রাইসিসে থাকা মানুষগুলোই সামাজিক ভাবে প্রতিষ্ঠা পাবার জন্য মরিয়া হয়ে চেয়ার টানাটানি প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে পড়ে, এখানেই শুরু প্রবাসের মাটিতে আমাদের সামাজিক অবক্ষয়।

নেতৃত্বের গুণাবলীসমৃদ্ধ ও সুশিক্ষিত ব্যক্তিত্বরা এগিয়ে আসলেই কথিত ভুল নেতৃত্ব থেকে সমাজ মুক্তি পাবে। আর সেই মুক্তির মিছিলে সামিল হবে সাধারণ অভিবাসীরাও।

আফাজ জনি, স্পেন।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ