প্রিয় হুমায়ুন

আমি তখন ক্লাস ফোর এ পড়ি। আমাদের বাড়ীর পাশেই একটা লাইব্রেরি ছিলো। বড় বোনদের হাত ধরে প্রত্যেকদিন বিকেলবেলা লাইব্রেরি তে যেতাম,একটু আধটু বই পড়তাম। সেই সময় আমার বাবা আমাকে একটা বই হাতে দিয়ে বললেন,নাও এই বই পড়। সেটা ছিল হুমায়ুন আহমেদের একটা বই।নামটা এখন মনে পড়ছে না। সেই থেকে হুমায়ুন আহমেদ এর বই পড়া শুরু। কখনো গাছের ডালে বসে কখনো পুকুরঘাটে আবার স্কুলেটিফিনের ফাঁকে হুমায়ুন আহমেদ এর বই পড়তাম।

আমি যখন ক্লাস সিক্স এ পড়ি, তখন অপেক্ষা বইটা প্রথম পড়ি। এই বইটা আমার এতো ভালো লেগেছিলো যে বইয়ের ভেতর লুকিয়ে লুকিয়ে পড়তাম। পরিক্ষার আগেরদিন যখন লুকিয়ে লুকিয়ে পড়ছিলাম, খুব ক্লাইমেনট একটা মুহুর্তে মা আসলো পড়াতে। কি বিপদ কি করি সাথে সাথে বইটা লুকিয়ে ফেলি। আমার মা পড়া দেখাচ্ছে আর আমার মনের মধ্যে তখন সুরাইয়া কি করল? কি হলো সুরাইয়ার সাথে। আমি পানি খাব বলে জামার ভিতরে বইটাকে লুকিয়ে রান্নাঘরে চলে গেলাম। পড়তে পড়তে সময়ের খেয়াল নেই। এদিকে মায়ের চিল্লাচিল্লি। এতক্ষনলাগে রান্নাঘরে?মা আসছে রান্না ঘরে চেক করতে। কারন আমার বই পড়ার ব্যাপারটা মা কিছুটা জানত। আমি কোন উপায় না পেয়ে বইটাকে রান্নাঘরের জানালা দিয়ে ফেলে দিলাম।সে যাত্রায় রক্ষা পেয়েছিলাম। কোন ঘটনা ছেড়ে কোনটা লিখব বুঝতে পারছি না। হুমায়ুন আহমেদের বই এতো ভালো লাগে! কথাশিল্পে যেনো এক বীরের প্রতিচ্ছবি।

গল্পের প্রতিটা লাইন, সাবলীল শব্দ, নীল রংয়ের প্রতি মায়া জন্মানো, ভেজা চুলের গন্ধ কি, জ্যোৎস্না দেখা, বৃষ্টিতে ভেজা, চাঁদের আলো গায়ে মাখা তা হুমায়ুন আহমেদের বই পড়ে বুঝেছি। এখন আমি জানি কি করে জ্যোৎস্নার আলো দুহাত ভরে ধরতে হয়, কি করে গানের লাইনগুলি ডায়রীর শেষ পাতায় টুকে রাখতে হয়।

বাংলা সাহিত্যে শব্দের যাদুকর ছিলেন হুমায়ুন আহমেদ।তিনি জানতেন কীভাবে মানুষকে বইয়ের প্রতিটি লাইনের গভীরে নিয়ে যেতে হয়।

ভালোবাসা কি, ভালোবাসা কিরকম হয়, উনার প্রতিটা শব্দ অত্যন্ত সাবলীলভাবে মস্তিষ্কে গেঁথে যাওয়ার মতো। শব্দের খেলায় ভালোবাসাময় হৃদয়ে একেঁছেন। হুমায়ুন আহমেদের গল্প, উপন্যাস, সাইন্স ফিকশন বই এবং নাটক সবকিছুই মনে হয় আমার জীবনের কোন না কোন অংশ। হুমায়ুন আহমেদ গল্পে গল্পে জীবনের কথা বলেছেন, আনন্দে বিষাদে ভাসিয়েছেন।

একবার কলকাতায় প্রয়াত কথাসাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও হুমায়ুন আহমেদের ব্যক্তিগত আড্ডা চলছিলো। আড্ডায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় অভিভূত হয়ে হুমায়ুন আহমেদকে বলেছিলেন – তোমার কথার মধ্যে যাদু আছে। কথা গুলো রেকর্ড করে রাখার মতো।

সেই নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদ নেত্রকোণার কেন্দুয়ায় ১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর হজন্মগ্রহণ করেন। বাবা ফয়জুর রহমান আহমেদ ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা। তিনি মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন। মায়ের নাম আয়েশা ফয়েজ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষক হিসেবে শুরু হয় তার পেশাজীবন। যদিও এখানে তিনি আর থাকেননি। লেখালেখিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় একসময় তিনি শিক্ষকতা ছেড়ে দেন।

১৯৭২ সালে প্রথম উপন্যাস নন্দিত নরকে প্রকাশের পরই ছড়িয়ে পড়েছিল তার খ্যাতি। ‘নন্দিত নরকে’, ‘শঙ্খনীল কারাগার’, ‘গৌরিপুর জংশন’ ‘বহুব্রীহি’, ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘দারুচিনি দ্বীপ’, ‘নক্ষত্রের রাত’, ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘আগুনের পরশমণি’, ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘জোছনা ও জননীর গল্প’- এই বইগুলোর চরিত্র গুলোই হুমায়ুন আহমেদকে এনে দিয়েছিলো অমরত্বের হাতছানি। হুমায়ুন আহমেদের হাতেই প্রান পেয়েছে বাংলা সাহিত্যের দুটি অসম্ভব পাঠকপ্রিয় চরিত্র মিসির আলী এবং হিমু। মানুষকে মুগ্ধ করার এক অদ্ভুত ক্ষমতা নিয়ে জন্মেছিলেন এক বিষ্ময়কর মানব।

বাংলা সাহিত্যের মহান এই কবি ও লেখক হুমায়ুন আহমেদ আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন ২০১২ সালের ১৯ জুলাই।

সহজ সাবলীল ভাষায় লিখে পাঠকের হৃদয়ে জায়গা পক্ত করবার নাম হুমায়ুন আহমেদ।অসংখ্য পাঠক তিনি বানিয়ে গেছেন। আমাদের ও উচিত সেই পাঠক সত্তাটাকে জাগিয়ে রাখা। বই পড়ুন বই পড়ুন এতেই লেখককে শ্রদ্ধা জানানো হবে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ